কনটেন্টটি শেষ হাল-নাগাদ করা হয়েছে: মঙ্গলবার, ৭ এপ্রিল, ২০২৬ এ ১১:৩০ AM
কন্টেন্ট: পাতা
যমুনা সেতু জাদুঘর এশিয়ার অন্যতম ব্যতিক্রমধর্মী ও উল্লেখযোগ্য একটি জাদুঘর। এটি টাঙ্গাইল জেলার ভূঞাপুর উপজেলার যমুনা সেতুর পূর্ব প্রান্তে অবস্থিত। এখানে উদ্ভিদ ও প্রাণীর নমুনা, যমুনা সেতু নির্মাণের দুর্লভ আলোকচিত্র এবং স্থানীয় মানুষের ব্যবহৃত ঐতিহ্যবাহী সামগ্রীর সমৃদ্ধ সংগ্রহ সংরক্ষিত রয়েছে।
জাদুঘরটি শুধু জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণেই সীমাবদ্ধ নয়; এখানে বিভিন্ন বন্যপ্রাণী, পাখির বাসা ও ডিম, সরীসৃপ, বিপন্ন উদ্ভিদের নমুনা (ফুল, ফল ও বীজসহ), স্বাদু ও সামুদ্রিক মাছ সংরক্ষণ করা হয়েছে। পাশাপাশি মাছ ধরার সরঞ্জাম, স্থানীয় মানুষের ঐতিহ্যবাহী ব্যবহার্য সামগ্রী এবং যমুনা সেতু নির্মাণকালীন গুরুত্বপূর্ণ তথ্য ও বিরল ছবি প্রদর্শিত হয়।
উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো—জাদুঘরে সংরক্ষিত কোনো প্রাণীকে প্রদর্শনের উদ্দেশ্যে ইচ্ছাকৃতভাবে হত্যা করা হয়নি। অধিকাংশ নমুনা প্রাকৃতিকভাবে মারা যাওয়া বা দুর্ঘটনায় মৃত প্রাণী থেকে সংগ্রহ করা হয়েছে; কিছু ক্ষেত্রে স্থানীয় মানুষের দ্বারা নিহত প্রাণীর নমুনাও সংরক্ষণ করা হয়েছে।
সংরক্ষিত নমুনা
বর্তমানে জাদুঘরে ৫,০০০-এর বেশি নমুনা সংরক্ষিত আছে। এর মধ্যে রয়েছে—
স্তন্যপায়ী প্রাণীর মধ্যে রয়েছে ইঁদুর-চিকা-কাঠবিড়ালির ৯টি প্রজাতি এবং বাদুড়ের ৬টি প্রজাতি। এছাড়াও বিভিন্ন প্রজাতির বক, হাঁস, চিল, বাজ, ঈগল, শালিক, গাঙচিল, কচ্ছপ, টিকটিকি ও ব্যাঙ রয়েছে। জাদুঘরে শতাধিক প্রজাতির ফড়িং এবং পাঁচ শতাধিক অন্যান্য পোকামাকড়ও সংরক্ষিত আছে।
স্তন্যপায়ী প্রাণীর মধ্যে রয়েছে ৯ প্রজাতির ইঁদুর-চিকা-কাঠবিড়ালি, ৬ প্রজাতির বাদুড়, বিভিন্নপ্রজাতির বক, হাঁস, চিল-বাজ ঈগল, আবাবিল পাখি, কচ্ছপ, টিকটিকি ও ব্যাঙ। এছাড়াওশতাধিক প্রজাতির ফড়িং এবং পাঁচ শতাধিক অন্যান্য পোকামাকড় সংরক্ষিত আছে।
জাদুঘরে সংরক্ষিত উল্লেখযোগ্য কিছু প্রাণীর মধ্যে রয়েছে- নীলগাই, চিতাবাঘ, দৈত্য শকুন, নাগঈগল, মেছো ঈগল, মরু বাজ, বেগুনি বক, লাল বক, সবুজ ঘুঘু, বুনো মাছরাঙা, আবাবি, হুদহুদ পাখি, গেছো সাপ, ডোরা আঞ্জন, মর্মর ব্যাঙ, চিতা বিড়ালসহ আরও অনেক বিরলপ্রাণী।
শিক্ষা ও গবেষণায় ভূমিকা
টাঙ্গাইল ছাড়াও ঢাকা, মানিকগঞ্জ, গাজীপুর, কিশোরগঞ্জ, ময়মনসিংহ, জামালপুর, সিরাজগঞ্জ, পাবনা, নাটোর, রাজশাহী, বগুড়া ও গাইবান্ধা জেলার বিভিন্ন কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের শিক্ষার্থীদের জন্য এই জাদুঘর একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যবহারিক শিক্ষা কেন্দ্র। দেশের প্রায় সব ক্যাডেট কলেজ এবং বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরাও নিয়মিত এখানে শিক্ষা সফরে আসেন।
জাদুঘরের পরিবেশ পরিচ্ছন্ন, সুশৃঙ্খল, দুর্গন্ধমুক্ত এবং শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত। প্রতিটি নমুনায় বাংলা, ইংরেজি ও বৈজ্ঞানিক নামসহ সংক্ষিপ্ত বর্ণনা দেওয়া আছে, যা দর্শনার্থীদের জন্য অত্যন্ত তথ্যবহুল। শিশু ও শিক্ষার্থীদের জন্য এটি একটি অনন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য গবেষণায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
প্রতিষ্ঠার ইতিহাস
যমুনা সেতু নির্মাণকাল (১৯৯৫–১৯৯৭) চলাকালে সেতু কর্তৃপক্ষের পরিবেশ ইউনিটের অধীনে পরিচালিত “Wildlife Conservation and Survey” কর্মসূচির অংশ হিসেবে জাদুঘরটি প্রতিষ্ঠিত হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক Kazi Zaker Hossain-এর নেতৃত্বে Bangladesh Wildlife Society এটি প্রতিষ্ঠা করে।
বর্তমানে জাদুঘরের জন্য একটি আধুনিক তিনতলা ভবনের নির্মাণ কাজ প্রায় সম্পন্ন হয়েছে।
যাতায়াত
দেশের যেকোনো স্থান থেকে যমুনা সেতু পূর্ব রেলওয়ে স্টেশন বা বাসস্ট্যান্ডে নেমে অটোরিকশা বা অটোভ্যানে সহজেই জাদুঘরে পৌঁছানো যায়। ভাড়া সাধারণত ৫–১০ টাকা। বাস, ব্যক্তিগত গাড়ি বা মোটরসাইকেলেও সরাসরি যাওয়া যায়।
প্রবেশ মূল্য: জনপ্রতি ৫০ টাকা
ঠিকানা:
যমুনা সেতু আঞ্চলিক জাদুঘর
ভূঞাপুর, টাঙ্গাইল
মোবাইল: +880 1723-385558
পদ্মা সেতু জাদুঘরটি পদ্মা বহুমুখী সেতু প্রকল্পের পরিবেশ ব্যবস্থাপনা কর্মসূচির অংশ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এটি Bangladesh Bridge Authority (সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের সেতু বিভাগ)-এর উদ্যোগে এবং University of Dhaka-এর প্রাণিবিদ্যা বিভাগের বাস্তবায়নে গড়ে তোলা হয়েছে।
যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নের ফলে দেশে অনেক অবকাঠামো নির্মিত হয়েছে। পদ্মা সেতু এবং এর সংযুক্ত এক্সপ্রেসওয়ে বাংলাদেশের বৃহত্তম অবকাঠামোগত প্রকল্পগুলোর একটি। এই প্রকল্প বাস্তবায়নের ফলে পদ্মা নদী ও আশপাশের পরিবেশ ও বাস্তুতন্ত্রে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন এসেছে।
বড় অবকাঠামো নির্মাণের ফলে স্থানীয় জীববৈচিত্র্যের উপর প্রভাব পড়েছে। কিছু উদ্ভিদ ও প্রাণীর সংখ্যা কমেছে এবং কিছু প্রজাতি তাদের প্রাকৃতিক আবাস পরিবর্তন করতে বাধ্য হয়েছে। অন্যদিকে নতুন বনায়ন, অভয়ারণ্য সৃষ্টি এবং ভূমিরূপ পরিবর্তনের কারণে নতুন কিছু উদ্ভিদ ও প্রাণীর আবির্ভাবও ঘটেছে।
এই জীববৈচিত্র্যের পরিবর্তনের ইতিহাস সংরক্ষণের জন্য বাংলাদেশ সরকার একটি প্রাণিবৈজ্ঞানিক জাদুঘর প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে।
২০১৫ সালের নভেম্বর মাসে পদ্মা বহুমুখী সেতু প্রকল্প ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের মধ্যে একটি সমঝোতা স্মারক (MoU) স্বাক্ষরিত হয় এবং ২০১৬ সালের জানুয়ারি থেকে জাদুঘর উন্নয়নের কাজ শুরু হয়। সেতু এলাকায় একটি পৃথক ভবনে এই জাদুঘর স্থাপনের পরিকল্পনা করা হয়েছে।
এই জাদুঘরটি ভবিষ্যতে দর্শনার্থীদের জন্য আকর্ষণীয় কেন্দ্র হবে এবং স্থানীয় জীববৈচিত্র্য সম্পর্কে জানার সুযোগ দেবে।
জাদুঘরের উদ্দেশ্য
১. পদ্মা নদী ও আশপাশের এলাকার জীববৈচিত্র্যের নমুনা সংগ্রহ ও সংরক্ষণ করা, যাতে ভবিষ্যতে গবেষণার রেফারেন্স হিসেবে ব্যবহার করা যায়।
২. জনগণের মধ্যে জীববৈচিত্র্য ও তার সংরক্ষণ সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি করা।
৩. বন্যপ্রাণীর বৈচিত্র্য নিয়ে শিক্ষা ও গবেষণার সুযোগ সৃষ্টি করা।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, এই জাদুঘরটি আন্তর্জাতিক মান অনুসারে নির্মিত দেশের অন্যতম বৃহৎ ও আধুনিক জাদুঘর হবে।
জাদুঘর উন্নয়নে সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ দল
মোট ১৮ জন বিশেষজ্ঞ এই কাজের সাথে যুক্ত ছিলেন। তাদের মধ্যে রয়েছে—
প্রধান কার্যক্রম
১. নমুনা সংগ্রহ, সনাক্তকরণ ও যাচাই
পদ্মা নদী ও আশপাশের এলাকা থেকে অমেরুদণ্ডী প্রাণী থেকে স্তন্যপায়ী প্রাণী পর্যন্ত বিভিন্ন প্রাণীর নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে। বৈজ্ঞানিক নাম ও শ্রেণিবিন্যাস সঠিক রাখতে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী সেগুলো যাচাই করা হয়েছে।
বর্তমানে পদ্মা সেতু জাদুঘরে ৯০০ প্রজাতির ১৭০০-এর বেশি নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে। দেশের অন্যান্য অঞ্চল থেকেও গুরুত্বপূর্ণ ও বিরল প্রজাতি সংগ্রহ করা হয়েছে। বর্তমানে জাদুঘরে ১,৪২৩ প্রজাতির প্রায় ২,১৫৮টি নমুনা সংরক্ষিত আছে।
২. প্রাকৃতিক ঐতিহ্য সংগ্রহ
প্রাণীর নমুনা ছাড়াও স্থানীয় প্রাকৃতিক ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের নানা উপাদান সংগ্রহ করা হয়েছে—যেমন পাখির পরিত্যক্ত বাসা ও ডিম, প্রাণীর বিভিন্ন অঙ্গ, ঐতিহ্যবাহী নৌকার প্রতিরূপ এবং বিভিন্ন মাছ ধরার সরঞ্জাম। এ ধরনের প্রায় ২,৪০০টি বস্তু সংগ্রহ করা হয়েছে।
এছাড়াও পদ্মা সেতুর মডেল, ভাসমান ক্রেনের মডেল, নির্মাণকালীন স্মারক ও বিরল আলোকচিত্র সংরক্ষিত রয়েছে।
৩. নমুনা প্রক্রিয়াকরণ ও সংরক্ষণ
সংগ্রহ করা সব নমুনা আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী প্রক্রিয়াজাত ও সংরক্ষণ করা হয়েছে—যেমন স্টাফিং (ট্যাক্সিডার্মি), ভেজা সংরক্ষণ, পিনিং, প্রিন্টিং ও মডেল তৈরি। দীর্ঘমেয়াদে সংরক্ষণের জন্য যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
৪. প্রদর্শনী ব্যবস্থা
সংগ্রহ করা অধিকাংশ নমুনা আন্তর্জাতিক প্রদর্শনী পদ্ধতি অনুযায়ী সাজানো হয়েছে। কিছু নমুনা গবেষকদের জন্য রেফারেন্স হিসেবে সংরক্ষণ করা হয়েছে। অনেক প্রজাতি তাদের প্রাকৃতিক আবাসের অনুকরণে প্রদর্শন করা হয়েছে।
৫. ডাটাবেস উন্নয়ন
জাদুঘরের সব নমুনার তথ্য সংরক্ষণ ও সহজে খুঁজে পাওয়ার জন্য সফটওয়্যারভিত্তিক একটি ডাটাবেস তৈরি করা হয়েছে।
যাতায়াত
দেশের যেকোনো স্থান থেকে পদ্মা সেতুর মাওয়া প্রান্তে নেমে রিকশা, অটোরিকশা বা অটোভ্যানে সহজেই জাদুঘরে পৌঁছানো যায়। ভাড়া সাধারণত ১০–২০ টাকা। বাস, ব্যক্তিগত গাড়ি বা মোটরসাইকেলেও সরাসরি যাওয়া যায়।
প্রবেশ মূল্য: জনপ্রতি ৫০ টাকা
দর্শন সময়: প্রতিদিন সকাল ১০টা – বিকাল ৫টা (আগে যোগাযোগ করা উত্তম)
ঠিকানা:
পদ্মা সেতু জাদুঘর
সার্ভিস এরিয়া–১
মাওয়া, মুন্সীগঞ্জ
মোবাইল: +880 1777-338607